প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। নাসার প্রাক্তন বিজ্ঞানী নিমিশা মিত্তাল ও পরিচালক রাম মাধবানী স্পিলবার্গের অ্যালিয়েন ছবিগুলোতে বিজ্ঞান, আশা ও মানুষের সেন্স অফ বিলংগিং নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছেন। Disclosure Day-এর প্রেক্ষিতে এক মনোরম আলোচনা।
মুম্বাইয়ের একটি আরামদায়ক বারে সম্প্রতি একটি মনোরম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান এবং সিনেমার জগতের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব একসঙ্গে কথা বলেছেন। ফিল্মমেকার রাম মাধবানী এবং নাসার প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার নিমিশা মিত্তাল ‘All will be disclosed’ শিরোনামের এই আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যালিয়েন লাইফ, সিনেমায় তার চিত্রায়ণ এবং Disclosure Day নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা শেয়ার করেছেন। এই আলোচনা শুধু বিনোদনমূলক ছিল না, বরং বিজ্ঞানের আশা-নিরাশা এবং মানুষের মনের গভীর অনুভূতিকে স্পর্শ করেছে।
স্পিলবার্গের সিনেমায় অ্যালিয়েন রহস্য নিয়ে নাসা বিজ্ঞানীর খোলাখুলি কথা
নিমিশা মিত্তাল নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে (JPL) ১৫ বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। মঙ্গল গ্রহের রোভার এবং ক্যাসিনি স্পেস অরবিটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় অ্যালিয়েন লাইফ খুঁজে বের করার বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখে। “আপনারা সবসময় এটা শুনতে পান না, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবসময় একটা আশা থাকে যে কোনো না কোনোদিন আমরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারব। আমরা শুধু প্রমাণের অপেক্ষায় আছি। বুদ্ধিমান জীবন খুঁজে পাওয়ার আশা সবসময়ই আছে। তবে এখনও আমাদের মধ্যে পূর্ণ বিশ্বাস তৈরি হয়নি,” বলেন নিমিশা।
তাঁর কথায় স্পষ্ট হয় যে, SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) এর মতো প্রোগ্রামগুলো নীরবে চলছে। বিজ্ঞানীরা রেডিও সিগন্যাল, এক্সোপ্ল্যানেটস এবং বিভিন্ন গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে চলেছেন। তবে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এটা শুধুই আশার ব্যাপার। নিমিশা আরও বলেন যে, বিজ্ঞানীরা আসলে কখনো হাল ছাড়েন না। প্রতিটি নতুন মিশন, প্রতিটি নতুন ডেটা তাঁদের আশাকে জীবিত রাখে।
অন্যদিকে, রাম মাধবানী ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ছবি ‘নীরজা’ এবং জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘আর্যা’র পরিচালক। তিনি নিজেকে স্টিভেন স্পিলবার্গের আজীবন ভক্ত বলে দাবি করেন। আলোচনায় তিনি অ্যালিয়েন থিমের ছবিগুলোর মানসিকতাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেন। “পৃথিবীর বাইরে জীবন খোঁজার মূল কারণ হলো আমরা সবসময় এমন কাউকে খুঁজছি যে আমাদের বুঝবে। এই পৃথিবীর মানুষ যদি না বোঝে, তাহলে হয়তো বাইরের কেউ বুঝবে। এই সেন্স অফ বিলংগিং বা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অনুভূতিই এই ছবিগুলোকে চালিত করে,” বলেন মাধবানী।
স্পিলবার্গের ছবিতে অ্যালিয়েন যোগাযোগ
তাঁর মতে, ET (Extra-Terrestrial) বা Close Encounters of the Third Kind-এর মতো ছবিগুলো শুধু অ্যালিয়েন দেখানোর জন্য নয়। এগুলো মানুষের একাকিত্ব, যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে। আজও আমরা সম্প্রদায় হিসেবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। হয়তো বাইরের কোনো সভ্যতা আমাদের সমস্যাগুলো বুঝতে পারবে—এই আশাই আমাদের খোঁজ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
আলোচনায় স্পিলবার্গের ক্যারিয়ারের পাঁচ দশকের যাত্রা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। Disclosure Day ছবিটি স্পিলবার্গকে আবার তাঁর প্রিয় জেনরা সায়েন্স ফিকশনে ফিরিয়ে এনেছে। এই ছবিতে প্রশ্ন উঠেছে—কর্তৃপক্ষ কি তথ্য গোপন রাখার অধিকার রাখে, যা পুরো বিশ্বকে বদলে দিতে পারে? মাধবানী বলেন, “Close Encounters of the Third Kind বানানোর সময় স্পিলবার্গের বয়স ছিল প্রায় ৩৫। এখন তিনি প্রায় ৮০-এর কাছাকাছি। অ্যালিয়েন এবং পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর পরিবর্তন লক্ষণীয়। কিন্তু যেটা স্থির আছে তা হলো আশা। তাঁর প্রতিটি গল্পে আশার আলো জ্বলে। আমি আশা করি এই আশা তাঁর ফিল্মমেকিংয়ে সবসময় থাকবে।”
আরও পড়ুনঃ মাধুরী-ত্রিপ্তি-ধর্ণার ‘মা বেহেন’ নেটফ্লিক্সে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে!
Disclosure Day নিয়ে নাসা বিজ্ঞানী ও রাম মাধবানীর আলোচনা
Disclosure Day-এর গল্পে অ্যালিয়েন আগমন এবং তথ্য প্রকাশের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এমিলি ব্লান্ট, জোশ ও’কনর, কলিন ফার্থ, ইভ হিউসন এবং কোলম্যান ডোমিঙ্গোর মতো তারকাদের নিয়ে নির্মিত এই ছবি বর্তমানে বিশ্বের থিয়েটারে চলছে। ছবিটি শুধু বিনোদন নয়, বরং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
আলোচনার শেষভাগে একটি মজার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। ধরা যাক, অ্যালিয়েন প্রজাতি পৃথিবীতে এসেছে এবং প্রথম যোগাযোগের জন্য একজন অ্যাম্বাসাডর নির্বাচন করতে হবে। রাম মাধবানী হাসতে হাসতে বলেন, “অবশ্যই ইনটেলেকচুয়ালস বা বুদ্ধিজীবী সমাজ।” এই উত্তরে দর্শকদের মধ্যে হাসি এবং করতালি পড়ে যায়। নিমিশা মিত্তাল অবশ্য একটু ভিন্ন চিন্তা করেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা। তাই সবার পছন্দ একজনের সঙ্গে মিলবে না। তবে প্রথম যাঁর নাম মনে আসে তিনি হলেন কার্ল সাগান।” কার্ল সাগান ২০শ শতাব্দীর শেষভাগে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করেছিলেন। তাঁর Cosmos সিরিজ এবং বইগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষকে মহাকাশের রহস্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে।
এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, অ্যালিয়েনের খোঁজ শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, সাংস্কৃতিক এবং মানসিকও। স্পিলবার্গের ছবিগুলো বারবার দেখায় যে, অজানার সঙ্গে যোগাযোগ মানুষকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে। Close Encounters of the Third Kind-এ সাধারণ মানুষের সঙ্গে অ্যালিয়েনের যোগাযোগ, ET-এ বন্ধুত্বের গল্প—সবকিছুতেই মানুষের একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই এবং আশা প্রতিফলিত হয়।
রাম মাধবানী ও নিমিশা মিত্তালের চমকপ্রদ অ্যালিয়েন আলোচনা
বিজ্ঞানের দিক থেকে নিমিশা যেমন বলেছেন, আমরা এখনও প্রমাণের অপেক্ষায়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, বিভিন্ন মিশন এবং অ্যাডভান্সড রেডিও টেলিস্কোপগুলো প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু বুদ্ধিমান জীবনের স্পষ্ট সিগন্যাল এখনও পাওয়া যায়নি। তবু আশা অটুট। হয়তো একদিন আমরা জানতে পারব যে আমরা একা নই।
রাম মাধবানীর কথায় সিনেমার গুরুত্বও ফুটে ওঠে। সিনেমা শুধু গল্প বলে না, সমাজের আয়না হয়। স্পিলবার্গের মতো নির্মাতারা অ্যালিয়েন থিম ব্যবহার করে মানুষের মনের গভীর প্রশ্নগুলো তুলে ধরেন। Disclosure Day ছবিতে যে প্রশ্ন উঠেছে—তথ্য গোপন রাখা কি ঠিক? —তা আজকের বিশ্বে খুবই প্রাসঙ্গিক। সরকার, বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এসব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে ছবিটি।
এই আলোচনা শেষ হয় আশা নিয়েই। নিমিশা এবং রাম উভয়েই বিশ্বাস করেন যে, ভবিষ্যতে হয়তো আমরা অ্যালিয়েনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করব। সেই যোগাযোগ মানুষকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে। কার্ল সাগানের মতো ব্যক্তিত্বরা যেভাবে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তেমনি স্পিলবার্গের ছবিগুলো মানুষের কল্পনাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
Disclosure Day বর্তমানে থিয়েটারে চলছে। যারা সায়েন্স ফিকশন পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি একটি অবশ্যই দেখার ছবি। এই ছবি শুধু বিনোদন দেয় না, বরং চিন্তার খোরাক জোগায়। রাম মাধবানী এবং নিমিশা মিত্তালের এই আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান এবং শিল্পের মিলনই পারে মানুষকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিতে।
আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি—প্রমাণের অপেক্ষায়, যোগাযোগের অপেক্ষায়, এবং সেই আশার অপেক্ষায় যা স্পিলবার্গের ছবিগুলোতে সবসময় জ্বলজ্বল করে। হয়তো একদিন সত্যিই ‘All will be disclosed’ হবে।
