ইউএস-ইরান সংকটে তেলের গোপন যাত্রা: জাহাজ-থেকে-জাহাজ স্থানান্তরের মাধ্যমে ৯ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ ।
পারস্য উপসাগরের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যখন স্ট্রেইট অব হরমুজ বিশ্বের তেল চলাচলের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখনও যুক্তরাষ্ট্র এক অদ্ভুত কৌশলে তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছিল। ইরানের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশলকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করে আমেরিকা গোপনে ৯ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল সরিয়ে নিয়েছে। এই অভিযানে জড়িত হয়েছে কমপক্ষে ৯২টি জাহাজ, স্যাটেলাইট ইমেজ এবং শিপিং ডেটা তার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
মে মাসের শুরু থেকে এই অপারেশন চলছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হাল ছাড়েনি। তারা ইরানেরই পুরনো কৌশল—জাহাজ-থেকে-জাহাজ তেল স্থানান্তর (Ship-to-Ship transfer), আকাশ ও পানির ড্রোনের নিরাপত্তা এবং শাটলিং পদ্ধতি—ব্যবহার করে তেল বের করে নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
কীভাবে চলছিল এই গোপন অভিযান?
প্রণালীর কাছাকাছি দুটি জায়গা ছিল এই অপারেশনের মূল কেন্দ্র। একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূল, অন্যটি ওমানের সোহার বন্দরের কাছের এলাকা। এই দুই স্থান ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালী কর্তৃপক্ষের সীমানার খুব কাছাকাছি। তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো প্রথমে একটি নির্ধারিত মিলনস্থলে জড়ো হতো। তারপর তারা স্তরে স্তরে, ৩-৪ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে রওনা দিত। এতে একসঙ্গে অনেক জাহাজ দেখা যেত না এবং ঝুঁকি কমতো।
প্রণালীর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশে পৌঁছে জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হতো, আলো কমিয়ে রাখা হতো। ইউএস মিলিটারি নির্ধারিত ওয়েপয়েন্টস (পথনির্দেশক পয়েন্ট) অনুসরণ করে জাহাজগুলো এগোতো। প্রণালী পার হয়ে ইরানের দাবিকৃত এলাকার ঠিক বাইরে গিয়ে ছোট ট্যাঙ্কারগুলো খুব বড় ভলিউম ক্রুড ক্যারিয়ার (VLCC) জাহাজের পাশে ভিড়তো। সেখানে তেল স্থানান্তর চলতো ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত। খালি ট্যাঙ্কারগুলো আবার ফিরে আসতো, আর ভর্তি VLCCগুলো এগিয়ে যেতো গন্তব্যের দিকে।
১১ জুন স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, দুটি স্থানে একসঙ্গে ১৭ জোড়া জাহাজ তেল স্থানান্তর করছে। পুরো অপারেশন ছিল ইউএস মিলিটারির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। একজন সূত্র রয়টার্সকে বলেছেন, “আমেরিকানরা সবসময় তোমাদের ওপর নজর রাখছে।”
ইরানের কৌশলই আমেরিকার অস্ত্র
ইরান বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই Ship-to-Ship পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। তারা সাধারণত এক জোড়া জাহাজ একবারে চালাতো, যাতে সনাক্ত না হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলকে বড় আকারে প্রয়োগ করেছে। একসঙ্গে অনেক জাহাজ জড়িত থাকায় প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হয়েছে এবং বেশি পরিমাণ তেল সরানো সম্ভব হয়েছে। আকাশে ও পানিতে সশস্ত্র ড্রোনগুলো পাহারা দিয়েছে। এতে ইরানের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমেছে।
আরও পড়ুনঃ পিওকে-তে মধ্যরাতের অভ্যুত্থান: পাক সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম জনতার স্বাধীনতার লড়াই
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ও তার যোগসূত্র
৯ জুন স্ট্রেইট অব হরমুজের ওপর একটি ইউএস আর্মি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করেন। তেহরান বলেছে, এটি ইচ্ছাকৃত ছিল না, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে অসাবধানতাবশত ঘটেছে। কিন্তু রয়টার্সের চারটি সূত্র, যার মধ্যে একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাও আছেন, নিশ্চিত করেছেন যে এই হেলিকপ্টার তেল স্থানান্তর অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সেদিন সোহারের কাছে স্যাটেলাইট ছবিতে ছয় জোড়া ট্যাঙ্কার জড়ো হয়ে ছিল। এটি দেখিয়ে দেয় যে সামরিক হেলিকপ্টারগুলো শুধু নজরদারি নয়, অপারেশনের সক্রিয় অংশও ছিল।
পরিমাণ ও প্রভাব
রয়টার্সের অনুমান অনুসারে, মে মাস থেকে এই অফশোর নেটওয়ার্ক দিয়ে কমপক্ষে ৯০ মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড অয়েল ও পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট স্থানান্তর হয়েছে। যদিও এটি যুদ্ধপূর্ব গড় দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম, তবু এই সময়ে এটি ছিল বড় অর্জন। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং মিত্র দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালানো হয়েছে।
এই অপারেশনে যে কয়েকজন শিপার প্রণালী পার হতে রাজি হয়েছিলেন, তাদের সাহস ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। কারণ ইরানের হামলার হুমকি সবসময় ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি ও শান্তির সম্ভাবনা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক পিস ডিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা করেছেন যে আগামী শুক্রবার থেকে স্ট্রেইট অব হরমুজ আবার বিশ্ব তেল বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরবে। তবে এই গোপন অভিযান দেখিয়ে দিয়েছে যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দেশগুলো কীভাবে সৃজনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে।
এই ঘটনার গুরুত্ব
এই তেল স্থানান্তর অভিযান শুধু একটি লজিস্টিক সাফল্য নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন দিক দেখিয়েছে। ড্রোন, স্যাটেলাইট মনিটরিং, গোপন ওয়েপয়েন্টস এবং দ্রুত স্থানান্তর—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি উন্নত সামরিক-বাণিজ্যিক অপারেশন। ইরান যে কৌশল নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহার করতো, সেটাকেই বড় আকারে প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সঠিক ব্যবহারে অনেক বাধা অতিক্রম করা যায়।
তবে এই সাফল্যের পেছনে ঝুঁকিও কম ছিল না। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা তার উদাহরণ। ভবিষ্যতে এমন সংকট দেখা দিলে বিশ্ব কীভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করবে, সে নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। একইসঙ্গে এটি দেখায় যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অর্থনৈতিক স্বার্থ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশগুলো কতটা দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়।
এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু যতটুকু জানা গেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি নয়, বুদ্ধিমত্তা ও অভিযোজন ক্ষমতা দিয়েও সংকট মোকাবিলা করতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং মিত্রদের চাহিদা পূরণ করার জন্য এই গোপন যাত্রা ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
