পিওকে-তে মধ্যরাতের অভ্যুত্থান: পাক সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম জনতার স্বাধীনতার লড়াই

Bhaskar

পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) মধ্যরাতের অভ্যুত্থান: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জোরপূর্বক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম জনতার প্রতিবাদ।


PoK up in arms against Pakistan at midnight to seek freedom from the forced occupation of the Pakistan Army.


পাক অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে), যাকে পাকিস্তান ‘আজাদ কাশ্মীর’ বলে দাবি করে, সেখানে সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। মধ্যরাতে জনতা রাস্তায় নেমে এসেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে এবং স্বাধীনতার দাবিতে গর্জে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা এবং সেনাবাহিনীর দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মুসলিম জনগণের এই ক্ষোভ এখন বিস্ফোরক আকার ধারণ করেছে। রাওয়ালাকোট, মুজাফফরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় চলমান এই আন্দোলন শুধুমাত্র দৈনন্দিন সমস্যার বিরুদ্ধে নয়, বরং পাকিস্তানের জোরপূর্বক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে।



আন্দোলনের সূচনা ও কারণ


সবকিছু শুরু হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে। আটা, চাল, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং মৌলিক সুবিধার অভাবে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) নামে একটি নাগরিক সংগঠন এই দাবিগুলোকে সংগঠিত করে। তারা ৩৮ দফা দাবিনামা পেশ করে, যাতে সস্তা আটা-চাল, বিদ্যুতের ভর্তুকি, শিক্ষা-চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়। কিন্তু পাকিস্তানি প্রশাসন এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।


সম্প্রতি পিওকে অ্যাসেম্বলিতে ১২টি আসন কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এই আসনগুলো পাকিস্তানের বাইরের লোকেদের দিয়ে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করছে। এই ইস্যুতে জেএএসি’র আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জেএএসি’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালায়। রাওয়ালাকোটে একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জড়ো হওয়া জনতার ওপর গুলিবর্ষণে অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৭০ জনের বেশি আহত হন। এরপর থেকে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।



মধ্যরাতের অভ্যুত্থান ও দমন-পীড়ন

সাম্প্রতিক খবর অনুসারে, মধ্যরাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও পুলিশ ব্যাপক অভিযান চালায়। রাওয়ালাকোট ও মুজাফফরাবাদকে সামরিক ছাউনিতে পরিণত করা হয়। হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, গ্রেপ্তার চলছে এবং নেতাদের মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০-এর বেশি বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। শতাধিক আহত হয়েছেন এবং শতাধিক গ্রেপ্তার হয়েছে, এমনকি শিশুরাও এর আওতায় পড়েছে।


একজন প্রতিবাদী নেতা শওকত মিরজা পাক সেনাবাহিনী ও সরকারকে ‘ডাইনি’ বলে অভিহিত করেছেন, যারা নিজেদের জনগণকেই হত্যা করছে। জনতা স্লোগান দিচ্ছে — “পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আমাদের কাশ্মীর ছেড়ে যাও”, “বিদেশি জুলুমবাজরা চলে যাও”। এই আওয়াজ শুধু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাকিস্তানের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়েছে।


পিওকে’র মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের শোষণের শিকার। তাদের সম্পদ লুট করা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা হয় পাকিস্তানের স্বার্থে, কিন্তু স্থানীয়দের উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় প্রচুর, কিন্তু স্থানীয়রা বেশি দামে কিনতে বাধ্য। রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুলের অবস্থা শোচনীয়। এছাড়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। যেকোনো বিরোধিতাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চিহ্নিত করা হয়।



মুসলিম জনতার ক্ষোভ ও বাস্তবতা

এটা উল্লেখযোগ্য যে, পিওকে’র অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম। তারা পাকিস্তানকে ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্বের’ দেশ বলে মনে করতেন, কিন্তু বাস্তবে দেখছেন শোষণ ও দমন। প্রতিবাদকারীরা বলছেন, পাকিস্তান তাদেরকে ‘কাশ্মীরি ভাই’ বলে প্রচার করে, কিন্তু আসলে তাদেরকে দাসের মতো ব্যবহার করছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ — দোকানদার, শ্রমিক, ছাত্র, পরিবার — সবাই একসঙ্গে রাস্তায়। তারা শুধু খাবার-বিদ্যুৎ চায় না, চায় মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব এবং স্বাধীনতা।


ভারতীয় কাশ্মীরের অনেক মুসলিমও এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শ্রীনগরে প্রতিবাদ হয়েছে, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার নিন্দা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উঠে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের ইসলামি জিহাদিদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে আকুতি



ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট


পিওকে’র এই অসন্তোষ নতুন নয়। ২০১৯ সালেও স্বাধীনতার দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছে। ২০২৪ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বড় আন্দোলন হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ঘটনা আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকট এই আন্দোলনকে আরও জোরালো করেছে। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে।


স্থানীয় নেতারা বলছেন, এটা শুধু প্রতিবাদ নয়, এটা একটা জাগরণ। তারা চান পাকিস্তানের দখলমুক্ত স্বাধীন কাশ্মীর। কেউ কেউ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দাবিও তুলেছেন, যদিও এটা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মত নয়। মূল দাবি হলো — আর কোনো শোষণ নয়, আর কোনো দমন নয়।



ভবিষ্যতের সম্ভাবনা


পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত। ইন্টারনেট বন্ধ, সেনা মোতায়েন এবং গ্রেপ্তার সত্ত্বেও জনতা পিছু হটছে না। জেএএসি নেতারা বলছেন, আপস নয়, লং মার্চ চলবে। পাকিস্তান সরকার যদি সংলাপের পথ না নেয়, তাহলে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।


পিওকে’র এই ঘটনা একটা বড় শিক্ষা। এটা দেখিয়ে দেয় যে, জোর করে কোনো জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখা যায় না। মুসলিম ভাই-বোনেরা যখন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করে, তখন সেটা সারা বিশ্বের কাছে প্রশ্ন তুলে দেয় — দখলদারিত্ব কতদিন চলবে? কাশ্মীরের মানুষ, উভয় পাশের, শান্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চায়। পাকিস্তানের এই দমনমূলক নীতি শুধু পিওকে নয়, নিজেদের অস্থিরতাকেও তীব্রতর করছে।


এই আন্দোলন যদি সফল হয়, তাহলে এটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রকেই বদলে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর যখন উঠে আসে, তখন কোনো সেনাবাহিনী বা সরকার তা চিরকাল চেপে রাখতে পারে না। পিওকে’র মুসলিম জনতা আজ সেই সত্যটাই প্রমাণ করছে — স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য লড়াই কখনো থেমে থাকে না।


উৎসসমূহ: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তথ্য যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, যাতে জনগণের কণ্ঠস্বর সঠিকভাবে উঠে আসে।