ইউসুফ পাঠানের আসন নিয়ে জল্পনায় পানি ঢেলে দিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি

Bhaskar

টিম মমতা ভেঙে পড়ার মাঝে সৌরভ গাঙ্গুলি স্পষ্ট জবাব দিলেন নিজের ‘ভূমিকা’ নিয়ে: ‘ইউসুফ পাঠানের কাছে যোগাযোগ করিনি’

Sourav Ganguly clears air on Yusuf Pathan seat speculation for Mamata Banerjee (x.com)


রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা চলছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদে প্রবেশ করতে চান এবং তার জন্য তাঁর একজন অনুগত সাংসদকে আসন ছাড়তে বলতে পারেন, যাতে উপনির্বাচনে তিনি লড়াই করতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি শনিবার একটি খবরকে পুরোপুরি মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। খবরটিতে দাবি করা হয়েছিল যে, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে তিনি বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠানের কাছে গিয়ে তাঁর লোকসভা আসন ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখান থেকে উপনির্বাচনে লড়তে পারেন।


সৌরভ গাঙ্গুলি ৬ জুন তারিখে একটি স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে সব মিডিয়া হাউসের উদ্দেশে জানিয়েছেন যে, তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত এই অভিযোগগুলো “সত্যের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে” তৈরি করা হয়েছে। তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার ৪ জুনের প্রথম পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে শিরোনাম ছিল ‘মমতা দিল্লি যাচ্ছেন সরাসরি লড়াইয়ে’।


ওই রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, সৌরভ গাঙ্গুলি, যিনি অতীতে রাজনীতিতে আসার অনেক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা ইউসুফ পাঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর ইউসুফ পাঠান নাকি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।



সৌরভ কী বললেন?


বিবৃতিতে সৌরভ গাঙ্গুলি স্পষ্ট করে লিখেছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে কখনোই কোনো বার্তা ইউসুফ পাঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেননি—চাই সেটা তাঁর সাংসদ পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয় হোক বা অন্য কিছু। আমি কখনোই ইউসুফ পাঠানের সঙ্গে এমন কোনো অনুরোধ বা বার্তা নিয়ে যোগাযোগ করিনি। তাই ওই প্রতিবেদনে যেভাবে বলা হয়েছে যে ইউসুফ পাঠান সাড়া দিয়েছেন বা প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেই প্রশ্নই ওঠে না।”


তিনি আরও যোগ করেছেন যে, “আমি কখনোই কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে কারও সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।” মিডিয়ার প্রতি তিনি আবেদন জানিয়েছেন যে, “গুজব আর জল্পনা-কল্পনার ভিত্তিতে খবর ছাপানোর আগে সত্যতা যাচাই করে নিন।”


ইউসুফ পাঠান বা তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও ওই রিপোর্ট নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি।


আরও পড়ুনঃ ব্যারিয়াট্রিক সার্জন বললেন মাউনজারো কারা আসলে নেবেন আর বন্ধ করলে কী হয়?



ইউসুফ পাঠান কে?


ইউসুফ পাঠান ২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি বহরমপুর থেকে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে প্রায় ৮৫,০০০ ভোটে পরাজিত করেন। কলকাতা নাইট রাইডার্সে (কেকেআর) সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তাঁর সংক্ষিপ্ত সময়ের সতীর্থতাও ছিল আইপিএলে।



মমতার জন্য কঠিন সময়

এই খবরটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। দলটি ২৯৪ আসনের মধ্যে মাত্র ৮০টিতে জয়ী হয়েছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আসনটিও সুবেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন। এখন দলের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা চলছে। দলের তিন দশকের ইতিহাসে এটাকে সবচেয়ে বড় সংকট বলে মনে করা হচ্ছে।


এই সপ্তাহে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহ করেছেন। বিধানসভার স্পিকার বিতাড়িত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তৃণমূল এই সিদ্ধান্তকে “অবৈধ” বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা করছে।


শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে দলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্রোহীদের বাইরে মাত্র আটজন বিধায়ক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।



রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জল্পনা


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন নানা জল্পনা চলছে। বিধানসভায় পরাজয়ের পর তিনি কীভাবে আবার সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে ফিরবেন—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। কেউ কেউ বলছেন, তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে আসতে চাইছেন। আর সেজন্যই বহরমপুরের মতো একটি শক্তিশালী আসনকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলির বিবৃতি এই জল্পনায় পানি ঢেলে দিয়েছে।


সৌরভ গাঙ্গুলি বরাবরই রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল থেকে প্রস্তাব এলেও তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে তিনি বাংলা ও ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর এই বিবৃতি দেখিয়ে দিয়েছে যে, তিনি এখনও রাজনৈতিক জলঘটায় জড়াতে চান না।


অন্যদিকে, ইউসুফ পাঠানও একজন জনপ্রিয় ক্রিকেটার। তাঁর জয়ের পর তৃণমূল আশা করেছিল যে, তিনি দলে শক্তি যোগাবেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে দলের ভিতরের অস্থিরতা তাঁর মতো নেতাদেরও চিন্তায় ফেলেছে।



দলের ভবিষ্যৎ কোথায়?


তৃণমূল কংগ্রেস এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। ৫৮ জন বিধায়কের বিদ্রোহ, নেতৃত্বের সঙ্কট, আদালতে লড়াই—এসব মিলিয়ে দলের ঐক্য ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনী ফলাফল দেখিয়েছে যে, জনসমর্থনের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।


এই পরিস্থিতিতে সৌরভ গাঙ্গুলির মতো একজন নিরপেক্ষ ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে খবর ছড়ানোকে অনেকেই অপপ্রচার বলে মনে করছেন। তাঁর বিবৃতি শুধু নিজেকে রক্ষা করেনি, বরং রাজনৈতিক গুজবের বিরুদ্ধেও একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।


মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তাঁর আহ্বানও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দ্রুতগতির সংবাদমাধ্যমে গুজব ছড়ানো সহজ, কিন্তু সত্য যাচাই না করে প্রকাশ করলে তা সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করে। সৌরভের এই বিবৃতি সেই দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।



বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিদ্রোহী বিধায়কদের ভূমিকা—সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সৌরভ গাঙ্গুলির মতো ব্যক্তিরা যখন এই ধরনের গুজবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন তা সত্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।


ইউসুফ পাঠানের আসন নিয়ে যে জল্পনা ছিল, সৌরভের বিবৃতির পর তা অনেকটাই শান্ত হয়েছে। তবে তৃণমূলের সংকট এখনও চলছে। দল কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে উঠবে, আগামী দিনে তা দেখার বিষয়।