ব্যারিয়াট্রিক সার্জনের মতে, মাউনজারো (টিরজেপাটাইড) কোন BMI-তে সবচেয়ে বেশি কাজ করে? BMI ২৭-৩০ এর লোকেরা সবচেয়ে লাভবান। বন্ধ করলে ওজন ফিরে আসে কেন? জানুন বিস্তারিত সতর্কবার্তা ও বাস্তবতা!
আজকাল ওজেম্পিকের পর আরেকটা ডায়াবেটিসের ওষুধ খুব আলোচনায় এসেছে— মাউনজারো (টিরজেপাটাইড)। এটা মূলত টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার হয়, কিন্তু ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এর দারুণ কার্যকারিতা দেখা গেছে। এ নিয়ে এখন সবাই কথা বলছে। সম্প্রতি কমেডিয়ান ঐশ্বর্যা মোহনরাজ এই ওষুধ ব্যবহারের কথা খোলাখুলি বলেছেন, আর সোহা আলি খান তাঁর এই সাহসের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু এত সুবিধা থাকলেও, এটা কখনোই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রথমে সবাইকে জানতে হবে এটা কীভাবে কাজ করে, কারা এটা নিতে পারে, আর কতদিন চালাতে হবে।
হিন্দুস্তান টাইমস লাইফস্টাইল এর একটা আর্টিকেলে নভি মুম্বাইয়ের ফর্টিস হিরানন্দানি হাসপাতালের ল্যাপারোস্কোপিক ও ব্যারিয়াট্রিক সার্জন ডা. শরদ শর্মার সঙ্গে কথা বলে এই ওষুধ নিয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তিনি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন কারা আসলে এটা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ পাবে, আর বন্ধ করলে কী হয়।
মাউনজারো কীভাবে কাজ করে?
ডা. শর্মা বলেন, মাউনজারো ওজন কমাতে সাহায্য করে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে। এটা ক্ষুধা কমায়, পাকস্থলীর খালি হওয়া দেরি করে, পেট ভরা অনুভূতি বাড়ায় এবং শরীরের মেটাবলিজমকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, কম ডোজে গড়ে ১০-১৫% ওজন কমে, আর উচ্চ ডোজে ১৫-২২% পর্যন্ত ওজন কমানো সম্ভব। এটা GIP এবং GLP-1 রিসেপ্টরকে টার্গেট করে কাজ করে, যা শরীরের ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে অনেকে দ্রুত ওজন কমাতে পারেন, বিশেষ করে যাদের লাইফস্টাইল চেঞ্জ একা কাজ করছে না।
আরও পড়ুনঃ Samsung Galaxy S26 Ultra কীভাবে S25 Ultra-কে হারাবে? লিক ও রিপোর্টের ফুল ডিটেইলস
মাউনজারো বন্ধ করলে কী হয়?
এখানেই আসল সমস্যা। ডা. শর্মা সতর্ক করে বলেছেন, ওষুধ বন্ধ করলে হারানো ওজন অনেকাংশে ফিরে আসতে পারে। এটা হাইপারটেনশন বা ডায়াবেটিসের ওষুধের মতোই—লং-টার্ম থেরাপি হিসেবে কাজ করে। বন্ধ করলে ক্ষুধা আবার বেড়ে যায়, পাকস্থলীর গতি স্বাভাবিক হয়ে যায়, আর মেটাবলিক সুবিধাগুলো কমে যায়। অনেক স্টাডিতে দেখা গেছে, বন্ধ করার পর ১ বছরের মধ্যে হারানো ওজনের বড় অংশ ফিরে আসে—কখনো ৮০% বা তার বেশি। এছাড়া রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার মাত্রা আবার খারাপ হতে পারে। তাই এটা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সা হিসেবে দেখা হয়, যতক্ষণ না লাইফস্টাইল চেঞ্জ দিয়ে ওজন ধরে রাখা যায়। বন্ধ করার সময় ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে ধীরে ধীরে ডোজ কমানো উচিত, যাতে শরীর অভ্যস্ত হয়।
কারা আসলে মাউনজারো নিতে পারে? কোন BMI ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি লাভ?
ডা. শর্মা তিনটা প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বলেছেন:
- BMI ৩০-এর কম বা ২৭ বা তার বেশি কমরবিডিটি (অন্য রোগ) থাকলে: এই গ্রুপে টিরজেপাটাইড খুব কার্যকর। BMI ২৭+ এবং ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ফ্যাটি লিভার, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে এটা দারুণ কাজ করে। লাইফস্টাইল চেঞ্জ একা যথেষ্ট না হলে এটা মনোথেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এই ক্যাটাগরিতে ওজন কমানোর পাশাপাশি ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ে, রক্তচাপ-লিপিড প্রোফাইল ভালো হয়, ফ্যাটি লিভার কমে। এরা সবচেয়ে বেশি লাভ পায়, কারণ ওষুধটা এদের মেটাবলিক সমস্যাগুলোকে সরাসরি টার্গেট করে।
- BMI ৩৫ বা তার বেশি এবং কমরবিডিটি থাকলে (যেমন টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া, হাইপারটেনশন): এখানে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চিকিত্সা। মাউনজারো দিয়ে ভালো ওজন কমলেও, লং-টার্মে একা এটা যথেষ্ট নাও হতে পারে, বিশেষ করে গুরুতর মেটাবলিক রোগ থাকলে। সার্জারি দিয়ে ২৫-৩৫% ওজন কমে এবং মেটাবলিক রিমিশনের হার বেশি। তবে যারা সার্জারি করতে চান না বা মেডিক্যালি প্রস্তুত নন, তাদের জন্য টিরজেপাটাইড ভালো অপশন হতে পারে।
- BMI ৪০ বা তার বেশি (মরবিড অবেসিটি): এখানে ডা. শর্মা খুব স্পষ্ট—সার্জারিই সবচেয়ে কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী। স্লিভ গ্যাস্ট্রেকটমি বা রু-এন-ওয়াই গ্যাস্ট্রিক বাইপাসের মতো অপারেশন ৫-১০ বছর ধরে ২৫-৩৫% ওজন কমিয়ে রাখতে পারে। ওষুধ একা এতটা কার্যকর নয়, বিশেষ করে খুব বেশি ওজন থাকলে। তাই খুব মোটা মানুষদের জন্য মাউনজারোকে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সারাংশে বলা যায়, মাউনজারো (টিরজেপাটাইড) অবেসিটি এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জন্য খুব প্রমিসিং একটা অপশন, কিন্তু এটা কোনো কুইক ফিক্স নয়। BMI ২৭-৩০ এর মধ্যে কমরবিডিটি থাকলে এরা সবচেয়ে বেশি উপকার পায়। উচ্চ BMI-তে সার্জারি ভালো। আর বন্ধ করলে ওজন ফিরে আসার ঝুঁকি অনেক।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই আর্টিকেল শুধু তথ্যের জন্য। এটা কোনো মেডিক্যাল অ্যাডভাইসের বিকল্প নয়। আপনার যদি এই ওষুধ নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। স্ব-চিকিত্সা করবেন না, কারণ সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে এবং সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
