সমস্ত আবহাওয়ায় ‘লাইফলাইন’: কাশ্মীর ও লাদাখকে যুক্ত করবে জোজিলা টানেল, পর্বত ভেদ করে দুই প্রান্ত মিলল।
দীর্ঘদিন ধরে শীতকালে লাদাখের মানুষের জীবন ছিল এক প্রকার বিচ্ছিন্নতার মধ্যে। রাস্তাঘাট বরফে ঢেকে যেত, সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ত, চিকিৎসার জন্য কোনো উপায় থাকত না। মঙ্গলবার জোজিলা পাসের নিচে একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই বাস্তবতা থেকে অনেকটা দূরে সরে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
জোজিলা টানেলের পূর্ব প্রান্তে, লাদাখের মিনিমার্গের কাছে একটি ব্রেকথ্রু বিস্ফোরণের ফলে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গের দুই প্রান্ত অবশেষে মিলে গেছে। এর মাধ্যমে পর্বত ভেদ করার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি, জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবারের এই ঘটনা টানেলের দুই প্রান্তকে শারীরিকভাবে যুক্ত করেছে। তবে এখনও সিভিল কাজ, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি অনেক কাজ বাকি আছে। এই টানেলটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে। বিশ্বমানের নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে এটি নির্মিত হয়েছে, যা লাদাখে সারা বছর সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করবে।
নিতিন গড়করি বলেন, “আমি যখন বিজেপির সভাপতি ছিলাম তখন লাদাখ সফর করেছিলাম। সেখানকার মানুষ আমাকে বলেছিলেন যে ছয় মাস ধরে সবকিছু বন্ধ থাকে, কোনো যোগাযোগ থাকে না। স্থানীয়দের এই কষ্ট দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল।”
জোজিলা টানেল কী?
জোজিলা টানেলটি ঘোড়ার নালের আকৃতির, দুই লেনবিশিষ্ট একটি সুড়ঙ্গ। এর দৈর্ঘ্য ১৩.১ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,৫৭৮ ফুট উঁচুতে জোজিলা পাসের নিচ দিয়ে এটি চলে গেছে। টানেলটির প্রস্থ ৯.৫ মিটার এবং উচ্চতা ৭.৫ মিটার।
এটি শ্রীনগর-লে জাতীয় মহাসড়ককে অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে। টানেলের পশ্চিম প্রান্ত কাশ্মীরের সোনমার্গের কাছে বালতালে এবং পূর্ব প্রান্ত লাদাখের দ্রাসের মিনিমার্গে। দুই প্রান্তে ১৮ কিলোমিটার করে অ্যাপ্রোচ রোড রয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি, অ্যাপ্রোচ রোড ও সেতুসহ, সোনমার্গ থেকে মিনিমার্গ পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার বিস্তৃত।
নির্বাহী সংস্থা মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড (এমইআইএল) নিউ অস্ট্রিয়ান টানেলিং মেথড (এনএটিএম) ব্যবহার করে এই টানেল তৈরি করেছে। এই পদ্ধতিতে চারপাশের শিলাকে নিজেই লোড-বিয়ারিং স্ট্রাকচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূতাত্ত্বিক অবস্থার মধ্যেও এই কৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর গুরুত্ব
প্রতি বছর শীতে জোজিলা পাস বরফে ঢেকে যায়। মানালি-লে রাস্তাও একই অবস্থায় পড়ে। কার্গিলে নিয়মিত বিমান পরিষেবা না থাকায় শীতকালে লাদাখের বাসিন্দারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা বাণিজ্যের জন্য চলাচল করা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
টানেল চালু হলে পাস পার হওয়ার সময় মাত্র ১৫ মিনিটে নেমে আসবে এবং সারা বছর রাস্তা খোলা থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, “দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের মানুষ জোজিলা পাস বন্ধ থাকার কারণে অপরিসীম কষ্ট ভোগ করেছেন। টানেল চালু হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক উন্নতি ঘটবে।”
আরও পড়ুনঃ ইউসুফ পাঠানের আসন নিয়ে জল্পনায় পানি ঢেলে দিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি
কৌশলগত গুরুত্ব
শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, এই টানেলের কৌশলগত তাৎপর্যও অপরিসীম। শ্রীনগর-লে মহাসড়ক ভারতীয় সেনাবাহিনীর লাদাখে সরবরাহের প্রধান ধমনী। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই মহাসড়কের ওপর নজরদারি করে সেনা সরবরাহ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। টানেল চালু হলে শীতকালেও সেনা সরবরাহ অব্যাহত থাকবে, যা দেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে।
VIDEO | Zojila Tunnel Breakthrough Day: Union Minister Nitin Gadkari, Jammu and Kashmir LG Manoj Sinha, and CM Omar Abdullah are present at the spot where the final blast for the tunnel will be triggered shortly.
— Press Trust of India (@PTI_News) June 9, 2026
Asia's longest tunnel project, worth Rs 6,500 crore at Zojila,… pic.twitter.com/aBsT7Lz2Qt
প্রকল্পের ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সাফল্য
নিতিন গড়করি জানান, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই প্রকল্পটি তার অধীনে শুরু হয়। মূল টেন্ডার ছিল ১২,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭,০০০ কোটি টাকায় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু একটি টানেল নয়, এটি লাদাখের লাইফলাইন।” প্রকল্পটি মূলত চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারী, ২০২৪ সালের সন্ত্রাসী হামলা এবং চরম আবহাওয়ার কারণে দুই বছর বিলম্ব হয়। তবে জাতীয় মহাসড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্পোরেশন (এনএইচআইডিসিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত সময়সূচির চেয়ে ছয় মাস আগেই ব্রেকথ্রু সম্পন্ন হয়েছে।
কবে খুলবে টানেল?
বর্তমানে সিভিল কাজ শেষ করতে আরও সাত-আট মাস লাগবে। তারপর বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বসানো হবে। আশা করা হচ্ছে ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ মানুষের জন্য টানেল খুলে দেওয়া হবে।
জোজিলা টানেল শ্রীনগর-লে মধ্যে একটি অবিচ্ছিন্ন সারা বছরের রাস্তা করিডর তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এর আগে সোনমার্গের জেড-মোর টানেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানুয়ারিতে উদ্বোধন করেছেন। জোজিলা টানেল চালু হলে করিডর মিনিমার্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
রাস্তা যোগাযোগের পাশাপাশি কার্গিলে এখনও নিয়মিত বিমান পরিষেবা নেই। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই অনুষ্ঠানে নিতিন গড়করির কাছে এই দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “কার্গিলে নিয়মিত ও সরাসরি বিমান পরিষেবা চালু করা আরেকটি স্বপ্ন। আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সফল হয়নি। এটি কার্গিলবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি।”
আরও পড়ুনঃ ট্রাম্পের আদেশে লক্ষ লক্ষ ইউএফও নথি জনসাধারণের হাতে
এই প্রকল্পের বৃহত্তর প্রভাব
জোজিলা টানেল শুধু একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয়, এটি কাশ্মীর ও লাদাখের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে দেবে। শীতকালে লাদাখে পর্যটকদের আগমন বাড়বে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সারা বছর পণ্য পরিবহন করতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিরক্ষা দিক থেকে এটি ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। চীন সীমান্তের কাছাকাছি লাদাখে দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম পাঠানো সহজ হবে। এছাড়া প্রকল্পটি ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মূল খরচের চেয়ে অনেক কম খরচে কাজ সম্পন্ন করে সরকার প্রমাণ করেছে যে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।
এই টানেল নির্মাণে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে উচ্চ উচ্চতা, চরম ঠান্ডা, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, ভঙ্গুর শিলা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি। এরপরও প্রকৌশলীরা ও শ্রমিকরা অসাধারণ দক্ষতায় কাজ সম্পন্ন করেছেন।
আগামী দিনে এই টানেলের পূর্ণাঙ্গ চালু হওয়ার পর লাদাখের মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হবে। এটি শুধু একটি সুড়ঙ্গ নয়, এটি আশা ও সংযোগের প্রতীক। ভারতের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
.webp)