সুমো রিংয়ে নারী নিষেধাজ্ঞা: জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

Bhaskar

জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুমো রিংয়ে নারীদের প্রবেশের ওপর শতাব্দী প্রাচীন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাপানে অনেক ধর্মীয় স্থানে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, যার পেছনে ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি। এখন দেখার বিষয়, তাকাইচি এই প্রথা ভাঙতে পারবেন কি না—বিশেষ করে যখন জাপানি সমাজে নারীর ভূমিকা দ্রুত বদলাচ্ছে।

Ban on women in sumo ring: Big challenge for Japan's first female prime minister, world news bangla

গত অক্টোবরে সানে তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। এখন তাঁর সামনে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি সুমো রিংয়ে (দোহ্যো) নারীদের প্রবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারবেন?

আগামী রবিবার কিউশু গ্র্যান্ড সুমো টুর্নামেন্ট শেষ হবে। বিজয়ীকে প্রধানমন্ত্রীর ট্রফি (প্রাইম মিনিস্টার্স কাপ) প্রদান করা হবে। আগে কয়েকজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী এই ট্রফি দিতে সুমো রিংয়ে উঠেছেন। কিন্তু সানে তাকাইচি অত্যন্ত রক্ষণশীল নেত্রী। তিনি জাপানের ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গভিত্তিক মূল্যবোধ ও পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতির সমর্থক। তাই অনেকেই মনে করছেন, তিনি এই ট্যাবু ভাঙবেন না।


সানে তাকাইচি কি ভাঙবেন সুমো রিংয়ের শতাব্দী প্রাচীন ট্যাবু?

নারীদের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে জোরালো হয়েছে—এবং তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এখন জাপানকে একজন নারী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সমালোচকরা বলছেন, সুমোসহ আরও অনেক ধর্মীয় স্থানে নারী নিষেধাজ্ঞা আজকের জাপানি সমাজে নারীর পরিবর্তিত অবস্থানের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়।


সুমো রিং শুধু একটা অংশ, পুরো ছবি আরও বড়

জাপানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারী ভক্তদের কিছু পবিত্র পর্বত, ধর্মীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মন্দির, ধর্মীয় স্থান এবং উৎসবে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। সুমো রিং তার মধ্যে একটি মাত্র উদাহরণ।

আরও পড়ুন: india pakistan conflict: মোদী থেকে শেহবাজ, দুই প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়ে ট্রাম্প থামালেন যুদ্ধ


জাপানে নারীদের নিয়ে নানা বিশ্বাস

আইচি গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ধর্ম-লিঙ্গ বিশেষজ্ঞ নাওকো কোবায়াশি বলেছেন, বিশ্বের আরও অনেক জায়গায় এ ধরনের ট্যাবু আছে। কিন্তু জাপানের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে মাসিক ঋতুস্রাব ও সন্তান প্রসবের সঙ্গে নারীদের “অপবিত্রতা”র ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু বৌদ্ধ ধারার নারীবিদ্বেষী চিন্তাধারা।

মাউন্ট ফুজি-সহ অনেক পবিত্র পর্বত ও ধর্মীয় স্থানে নারী প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা গত কয়েক দশকে অনেকটাই তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু মন্দির, উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এখনো তা বহাল আছে। প্রফেসর কোবায়াশি জানিয়েছেন, এর অনেক নিষেধাজ্ঞাই আসলে ১৯শ শতাব্দীর মেইজি যুগে বা তার পরে চালু হয়েছিল। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে দূরে রাখায় এই ট্যাবুগুলো ভাঙা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সুমোর উৎপত্তি জাপানের আদি ধর্ম শিন্তো থেকে

সুমোর শুরু হয়েছিল জাপানের প্রাচীন শিন্তো ধর্মের রীতি থেকে। শিন্তো মূলত প্রকৃতিবাদী (অ্যানিমিজম) ধর্ম—এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে যে প্রকৃতিতে হাজার হাজার কামি বা আত্মা বাস করে। প্রায় ১৫০০ বছর আগে প্রথম সুমো ম্যাচগুলো হয়েছিল কামিদের উদ্দেশ্যে এক ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে। সেখানে ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা, মন্দিরে নৃত্য এবং অন্যান্য উপস্থাপনা থাকত। সেই থেকে সুমো রিংকে (দোহ্যো) পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়, আর নারীদের প্রবেশকে অপবিত্র বলে মনে করা হয়।


এখন প্রশ্ন উঠেছে—জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কি এই প্রাচীন ট্যাবু ভাঙবেন, নাকি ঐতিহ্যের নামে তা বজায় রাখবেন? সমাজ বদলাচ্ছে, নারীর অবস্থান বদলাচ্ছে—কিন্তু কিছু রীতি এখনো অটল। সানে তাকাইচির সিদ্ধান্তই বলে দেবে, জাপান কতটা প্রস্তুত আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের সামঞ্জস্য ঘটাতে।