ইরানের অর্থনৈতিক সংকটে জনতা উত্তাল! বিক্ষোভে ৪২ নিহত, ২২৭৭ গ্রেপ্তার। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, পাহলভীর আহ্বান ও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা। বিস্তারিত জানুন এই নিবন্ধে।
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং এখন এটি ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জনগণের একটি সর্বাত্মক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইরানের রিয়াল মুদ্রার মূল্যহ্রাস এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের উপর দমনমূলক অভিযান, মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এই আন্দোলনকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি) জানিয়েছে যে ২৮ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এই বিক্ষোভে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৯ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী, ৮ জন নিরাপত্তা কর্মী এবং ৫ জন শিশু বা কিশোর (১৮ বছরের নিচে) রয়েছে। নরওয়ে-ভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে যে শুধুমাত্র বুধবারেই ১৩ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কারণে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফক্স নিউজ এবং অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ থেকে ৪৫ এর মধ্যে হতে পারে, এবং ২,২০০ এর বেশি লোক গ্রেপ্তার হয়েছে।
তেহরানে বিশাল জনসমুদ্র
তেহরানে বিশাল সমাবেশ দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবি এবং ভিডিওতে দেখা যায় যে তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডে বিশাল জনসমুদ্র জমে উঠেছে। লোকেরা স্লোগান দিচ্ছে "মৃত্যু হোক স্বৈরাচারীর!" এবং "ইসলামিক রিপাবলিকের মৃত্যু হোক!"। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আবাদানেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। কিছু এক্স (পূর্বতন টুইটার) পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে তেহরান এবং মাশহাদে নিরাপত্তা বাহিনীকে তাড়া করা হয়েছে এবং সরকারি ভবনগুলিতে আগুন ধরানো হয়েছে। যদিও এই দাবিগুলি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবে এগুলি আন্দোলনের তীব্রতা প্রকাশ করে।
এইচআরএএনএ-এর রিপোর্ট অনুসারে, বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ ২১টি প্রদেশের অন্তত ৪৬টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। কুর্দীয় অঞ্চলে বাজার বন্ধের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে কুর্দিস্তান, পশ্চিম আজারবাইজান, কের্মানশাহ এবং ইলাম প্রদেশের ডজনখানেক শহর ধর্মঘটে যোগ দিয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে বিক্ষোভকারীদের উপর দমনমূলক অভিযানে আরও ৬০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২,২৭৭-এ পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১৬৬ জন ১৮ বছরের নিচে এবং ৪৮ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এছাড়া, রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় ৪৫টি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ঘটনা প্রচারিত হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
Incredible footage coming in from protest against Khamanei and Islamic Republic regime in Tehran this very hour. pic.twitter.com/zPeii5vFj1
— Bahman Kalbasi (@BahmanKalbasi) January 8, 2026
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অনলাইন ওয়াচডগ নেটব্লকস জানিয়েছে যে ইরানে জাতীয় স্তরে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে। "এই ঘটনা দেশজুড়ে বিক্ষোভকে লক্ষ্য করে ডিজিটাল সেন্সরশিপের একটি সিরিজের পরিণতি, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জনগণের যোগাযোগের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে," বলেছে নেটব্লকস। এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ২০১৯ সালের নভেম্বরের বিক্ষোভের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে, যখন কয়েক দিনের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে শত শত বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছিল। এবারও, রেজিম ইন্টারনেট বন্ধ করে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে, কিন্তু স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তির কারণে এটি সম্পূর্ণ সফল হয়নি।
এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা নির্বাসিত ইরানীয় ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভীকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করেছে। তিনি ইরানীয় সরকারকে যোগাযোগ লাইন বন্ধ করার জন্য নিন্দা করেছেন, যার মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ এবং স্যাটেলাইট সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টা রয়েছে। পাহলভী ইউরোপীয় নেতাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব অনুসরণ করে "ইরানের জনগণকে সমর্থন করতে" এবং "রেজিমকে দায়বদ্ধ করতে" আহ্বান জানিয়েছেন। পাহলভী, যিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগে তাঁর পিতার সাথে দেশ ছেড়েছিলেন, এখন এই আন্দোলনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তিনি বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় জাতীয় বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন, যা ইরানীয় জনগণকে একত্রিত করেছে। তাঁর বার্তায় বলা হয়েছে, "জনগণের দমন উত্তরহীন থাকবে না।" পাহলভীর এই আহ্বানের পর তেহরানে হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমেছে, যা রেজিমের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে কড়া সতর্কবার্তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি ইরানকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে যদি কর্তৃপক্ষ "লোকদের হত্যা শুরু করে" তাহলে ওয়াশিংটন "খুব কঠোর পদক্ষেপ নেবে"। ট্রাম্প ইরানীয় জনগণকে "সাহসী" বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, "আপনাদের দেশে যা ঘটেছে তা লজ্জাজনক।" এই বক্তব্য ইরানের উপর চাপ বাড়িয়েছে, কারণ ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে। ইরানের রিয়াল মুদ্রা ডলারের বিপরীতে ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে পৌঁছেছে, যা মূল্যস্ফীতির হার ৪০ শতাংশের উপরে নিয়ে গেছে।
এই বিক্ষোভের পটভূমিতে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট একটি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। গত কয়েক বছরে ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির কারণে ধসে পড়েছে। জল সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধি জনগণকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। বাজার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট অর্থনীতিকে আরও স্থবির করে দিয়েছে। এছাড়া, ইরানের প্রক্সি গ্রুপগুলিতে (যেমন হিজবুল্লাহ, হুতি) বিলিয়ন ডলার খরচ করা হলেও জনগণের পেনশন এবং মজুরি কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে এই আন্দোলন রেজিমের জন্য "পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন" হতে পারে, কারণ অর্থনীতি, দমন এবং প্রতিরক্ষা সবকিছু একসাথে ধসে পড়ছে।
আন্দোলনটি এখন ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান, কের্মানশাহ, শিরাজ এবং কোমের মতো শহরগুলিতে সংঘর্ষ তীব্র। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন দখল করছে, পুলিশ স্টেশন পোড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে লড়াই করছে। কিছু জায়গায় সেনা সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিয়েছে, যা রেজিমের অভ্যন্তরীণ ফাটল প্রকাশ করে। মহিলারা হিজাব ফেলে দিয়ে রাস্তায় নেমেছে, যা ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলনের স্মৃতি জাগায়।
ইউরোপ এবং আমেরিকা ইরানের উপর চাপ বাড়াচ্ছে
আন্তর্জাতিক প্রভাবও লক্ষণীয়। ইউরোপ এবং আমেরিকা ইরানের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। ট্রাম্পের সতর্কবার্তা এবং পাহলভীর আহ্বান একত্রিত হয়ে আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে যদি এই আন্দোলন সফল হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার মানচিত্র পাল্টে যাবে। হিজবুল্লাহ দুর্বল হবে, হুতিরা বিচ্ছিন্ন হবে এবং সিরিয়া-ইরাকের পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে। চীন তেলের সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত, এবং ভেনেজুয়েলাকে ইরানীয় কর্মকর্তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই আন্দোলন ইরানের জনগণের সাহস এবং সংকল্পের প্রতীক। দশকের পর দশক ধর্মীয় স্বৈরাচারের অধীনে থাকার পর, তারা এখন একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের দাবি করছে। পাহলভীর নেতৃত্বে এই পরিবর্তন যদি ঘটে, তাহলে ইরান একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। কিন্তু রেজিমের দমনমূলক কৌশল এখনও চলছে, এবং বিশ্বকে এই আন্দোলনকে সমর্থন করতে হবে যাতে আরও প্রাণহানি না ঘটে। এটি শুধু ইরানের লড়াই নয়, বিশ্বের শান্তির জন্য একটি লড়াই।
